কয়েকটি ধাতুর উৎস ধর্ম ও ব্যবহার

1. খনিজ কাকে বলে ?
উঃ ভূপৃষ্ঠে বা ভূগর্ভে শিলারূপে কঠিন অবস্থায় থাকা বিভিন্ন ধাতব যৌগ গুলিকে খনিজ (Mineral) বলে। 
যেমন - রেড হেমাটাইট (Fe2O3) হল লোহার একটি খনিজ।
2. আকরিক কি ?
উঃ যে খনিজ থেকে সহজে এবং কম ব্যয়ে ধাতু সংগ্রহ করা যায়, তাকে ঐ ধাতুর আকরিক (Ore) বলে। 
3. সব আকরিকই খনিজ, কিন্তু সব খনিজ আকরিক নয় কেন?
উঃ রেড হেমাটাইট থেকে খুব সহজে ও কম ব্যয়ে লোহা নিষ্কাশন করা যায়। তাই রেড হেমাটাইট (Fe2O3) কে লোহার আকরিক বলে। কিন্তু  আয়রন পাইরাইটিস (FeS2) থেকে সহজে ও কম ব্যয়ে লোহা নিষ্কাশন সম্ভব হয় না। তাই আয়রন পাইরাইটিস লোহার খনিজ হলেও একে আকরিক বলা যায় না। সুতরাং বলা যেতে পারে সব আকরিকই খনিজ কিন্তু সব খনিজ আকরিক নয়।
4. অ্যালুমিনিয়াম (Al)
পারমাণবিক ভর:- 27 পরমাণু ক্রমাঙ্ক :- 13 যোজ্যতা:
অ্যালুমিনিয়ামের উৎস:- অ্যালুমিনিয়ামের প্রধান আকরিক হলো বক্সাইট(Al2O3, 2H2O) এবং অন্য দুটি আকরিক হলো গিবসাইট (Al2O3, 3H2O) এবং ক্রায়োলাইট (AlF3, 3NaF)
ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, গুজরাট কর্ণাটক উত্তরপ্রদেশে বক্সাইট আকরিক পাওয়া যায়।
ক্ষারের সঙ্গে অ্যালুমিনিয়ামের বিক্রিয়া:-
সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড বা পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইড এর মতো তীব্র ক্ষারের জলীয় দ্রবণে অ্যালুমিনিয়ামের চূর্ণ মিশেয়ে উত্তপ্ত করলে সোডিয়াম অ্যালুমিনেট বা পটাশিয়াম অ্যালুমিনেট লবণ উৎপন্ন হয় ও হাইড্রোজেন নির্গত হয় । 
যথা: 2Al + 2NaOH + 2H2O = 2 NaAlO2 (সোডিয়াম অ্যালুমিনেট ) +3H2 
2Al + 2 KOH + 2 H2O = 2KAlO2(পটাশিয়াম অ্যালুমিনেট) + 3H2
ব্যবহার:- (i) রান্নার বাসন পত্র দরজা জানালার ফ্রেম টেবিল-চেয়ার তৈরি করতে,
ii) বিমান ও মোটরগাড়ির কাঠামো নির্মাণ করতে
iii) বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক তার প্রস্তুতে।
iv) ভাঙা রেল লাইন জোড়া দিতে ইত্যাদি প্রস্তুতিতে অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহৃত হয়।
5. অ্যালুমিনিয়াম পাতে মোড়া চাটনি খাওয়া উচিত নয় কেন?
উঃ কারণ চাটনিতে জৈব অ্যাসিড যেমন অ্যাসিটিক অ্যাসিড বা ভিনেগার থাকে। ঐ জৈব অ্যাসিড অ্যালুমিনিয়ামের সঙ্গে বিক্রিয়া করে যে লবণ উৎপন্ন করে তা চাটনির সঙ্গে আমারে দেহে প্রবেশ করে আমাদের শরীরের ক্ষতি করে।
6. ম্যাগনেসিয়াম (Mg)
পারমাণবিক ভর- 24 পরমাণু ক্রমাঙ্ক - 12 যোজ্যতা- 2
উৎস: ম্যাগনেসিয়াম এর প্রধান আকরিক গুলি হল 1.কার্নালাইট (MgCl2 , KCl, 6H2O), 2. ম্যাগনেসাইট (MgCO3), 3. ডলোমাইট ( MgCO3, CaCO3).
ভারতের তামিলনাড়ু ও কর্নাটকে ম্যাগনেসাইট পাওয়া যায়।
বিক্রিয়া: ম্যাগনেসিয়াম বায়ু জল ও ক্ষারের সাথে বিক্রিয়া হয় না।
তবে, ম্যাগনেসিয়াম বাড়িতে যখন করলে উজ্জ্বল শিখায় জ্বলে এবং সাদা বর্ণের ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড এবং হালকা হলুদ বর্ণের ম্যাগনেসিয়াম নাইট্রাইড উৎপন্ন করে।
2Mg + O2 = 2MgO ,
3Mg + N2 = Mg3N2
ব্যবহার: i) ফটোগ্রাফির ফ্লাশ বাল্ব ও সাংকেতিক আলো উৎপাদনে।
ii) বাজি ও বোমা তৈরি করতে।
iii) জৈব রসায়নের অতি প্রয়োজনীয় গ্রিগনার্ড বিকারক প্রস্তুতিতে
iv) বিমান ও মোটর গাড়ির কাঠামো এবং বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নির্মানে ব্যবহৃত ম্যাগনেলিয়াম (Mg + Al), ইলেকট্রন (Mg + Zn) প্রভৃতি ধাতুসংকর প্রস্তুতিতে ম্যাগনেসিয়াম ববহৃত হয়।
7. ম্যাগনেসিয়াম ধাতুতে আগুন লাগলে সেই আগুন কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) গ্যাস দিয়ে নেভানো যায় না কেন ?
উঃ কারণ জ্বলন্ত ম্যাগনেসিয়াম কার্বন ডাই অক্সাইড এর সাথে সঙ্গে বিক্রিয়া করে ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড ও কার্বন উৎপন্ন করে।
2Mg + CO2 = 2MgO + C

8. দস্তা বা জিঙ্ক ( Zn)
পারমাণবিক ভর- 65.5 পরমাণু ক্রমাঙ্ক- 30 যোজ্যতা:
উৎস:- জিংক এর প্রধান আকরিক গুলি হল জিংক ব্লেন্ড(Zns), ক্যালামাইন (ZnCO3)
ভারতের রাজস্থান, বিহার পাঞ্জাব ও তামিলনাড়ুতে জিংক ব্লেন্ড পাওয়া যায়।
বিক্রিয়া:- i) জিংক শুষ্ক বায়ু সাথে বিক্রিয়া করে না তবে বায়ুতে তীব্র উত্তপ্ত করলে সাদা ধোঁয়া আকারে উৎপন্ন জিংক অক্সাইড ক্রমশ শীতল হয়ে সাদা ঝুলের আকারে জমা হয়, একে দার্শনিক উল বা জিংক হোয়াইট বলে। যথা 2Zn + O2 = 2ZnO
ii) ক্ষারের সঙ্গে জিংকের বিক্রিয়া:- কস্টিক সোডা বা কস্টিক পটাশ দ্রবণের সঙ্গে জিংক চূর্ণ উত্তপ্ত করলে হাইড্রোজেন গ্যাস নির্গত হয় এবং দ্রবণে সোডিয়াম জিঙ্কেট বা পটাশিয়াম জিঙ্কেট উৎপন্ন হয়। যথা: Zn + 2NaOH = Na2ZnO2(সোডিয়াম জিংকেট) + H2,
Zn + 2KOH = K2ZnO2(পটাশিয়াম জিংকেট) + H2
ব্যবহার:- i) নানা রকম বৈদ্যুতিক ব্যাটারি প্রস্তুতিতে জিংক ব্যবহৃত হয়।
 ii) পরীক্ষাগারে বিজারক হিসেবে
 iii) সিক্ত পদ্ধতিতে সোনা ও রুপো নিষ্কাশনে জিংক ব্যবহৃত হয়।
 iv) জিংক হোয়াইট নামক সাদা রং তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।
 v) লোহার তৈরি জিনিসের উপর যাতে মরিচা না পড়ে সেজন্য লোহার তৈরি বস্তুর ওপর জিংকের প্রলেপ দিতে হয় জিংক ব্যবহৃত হয়।
 vi) যন্ত্রপাতি টেলিস্কোপ জলের কল বাসনপত্র অলংকার ফুলদানির সৌখীন আসবাবপত্র প্রস্তুতিতে জিংক ব্যবহৃত হয়।
9. জিংক লেপন বা গ্যালভানাইজেশন কি ?
উঃ লোহার তৈরি বস্তুকে মরিচার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বস্তুর ওপর জিংকের পাতলা প্রলেপ দেওয়া হয় একে জিংক লেপন বা গ্যালভানাইজেশন বলে। যেমন- টিন, বালতি, কোটা প্রভৃতি লোহার তৈরি জিনিসের ওপর জিংকের প্রলেপ দেওয়া হয়।
10. জিংকের প্রলেপ দেওয়া পাত্রে খাবার জিনিস রাখা উচিত নয় কেন ?
উঃ কারণ খাদ্যবস্তুর সঙ্গে জিংকের লবণ আমাদের শরীরে প্রবেশ করে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে সেজন্য।
11.লোহা বা আয়রন (Fe)
লোহার পারমাণবিক ভর :55.85 পরমাণু ক্রমাঙ্ক : 26 যোজ্যতা : 2, 3 
উৎস: লোহার প্রধান আকরিক গুলি হল ম্যাগনেটাইট (Fe3O4), ব্রাউন হেমাটাইট(2Fe2O3, 3H2O) রেড হেমাটাইট (Fe2O3).
বিক্রিয়া:- i) শুষ্ক বায়ু লোহার সঙ্গে বিক্রিয়া করে না। তবে বায়ুর উপস্থিতিতে লোহাকে তীব্র উত্তপ্ত করলে লোহা স্ফুলিঙ্গসহ উজ্জ্বলভাবে জ্বলতে থাকে এবং ফেরোসোফেরিক অক্সাইড (Fe3O4) উৎপন্ন করে। যথা: 3Fe + 2O2 = Fe3O4.
ii) লোহিত তপ্ত লোহার উপর দিয়ে স্টিম চালনা করলে ফেরোসোফেরিক অক্সাইড ও হাইড্রোজেন উৎপন্ন হয়।
যথা: 3Fe + 4H2O = Fe3O4 + 4H2
iii) লোহা ক্ষারের সঙ্গে কোন বিক্রিয়া করে না।
12. তামা বা কপার (Cu)
তামার পারমাণবিক ভর:63.5 পরমাণু ক্রমাঙ্ক: 29 যোজ্যতা :1,2 
উৎস: প্রকৃতিতে মৌল অবস্থায় খুব সামান্য পরিমাণ তামা পাওয়া যায়। তামার উল্লেখযোগ্য আকরিক গুলি হল কপার পাইরাইটিস (Cu2S,Fe2S3), কপার গ্লাস(Cu2S), কিউপ্রাইট (Cu2O).
ভারতের সিকিম ভুটান রাজস্থান বিহারের সিংভূম জেলায় ও পাঞ্জাবে কপারের আকরিক পাওয়া যায়।
বিক্রিয়া: তামাকে আর্দ্র বায়ুতে বহুদিন ফেলে রাখলে তামার উপর প্রথমে অক্সাইড বা সালফাইডের বাদামী রঙের আস্তরণ পড়ে এবং ঐ আস্তরণ ক্রমে সবুজ রঙের ক্ষারীয় কপার সালফেট [CuSo4, 3Cu(OH)2] এ পরিণত হয়।
তামা জল ও ক্ষারের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না।ব্যবহার: i) পিতলগঞ্জ জার্মান সিলভার বেল মেটাল প্রভৃতি প্রয়োজনীয় সংকর ধাতু তৈরি করতে।
ii) বৈদ্যুতিক তার মোটর জেনারেটর ট্রান্সফর্মার ইত্যাদি প্রস্তুতিতে।
iii) রান্নার বাসনপত্র ও মুদ্রা তৈরিতে।
iv) তড়িৎ লেপন ও তড়িৎ মুদ্রণে তামা ব্যবহৃত হয়।
13. বৈদ্যুতিক তারে তামা এবং রান্নার বাসন পত্র নির্মাণে অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবহার করার কারণ কি?
উঃ তামা বিদ্যুতের সুপরিবাহী বলে তামার তার ব্যবহার করা হয়। এবং অ্যালুমিনিয়াম তাপের সুপরিবাহী ও হালকা ধাতু তাই রান্নার বাসন পত্র নির্মাণে অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহৃত হয়।
14. সংকর ধাতু কাকে বলে?
উঃ দুই বা তার বেশি ধাতু পরস্পর মিশে যে সমসত্ব বা অসমসত্ত্ব মিশ্রণ উৎপন্ন করে, সেই কঠিন ধাতব পদার্থকে ধাতু সংকর বা সংকর ধাতু (Alloy) বলে।
যেমন: তামা ও দস্তার মিশ্রণে পিতল উৎপন্ন হয় এটি একটি সংকর ধাতু। 
ইস্পাত হল লোহা ও কার্বনের সংকর ধাতু।
15. পারদ সংকর বা অ্যালামগাম কাকে বলে?
উঃ সংকর ধাতুর একটি উপাদান পারদ হলে তাকে পারদসংকর বা অ্যালাম গাম বলে।
যেমন- দস্তার পারদ সংকর তড়িৎ কোষ প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয়।
16. কলঙ্কহীন ইস্পাত কাকে বলে?
উঃ আর্দ্রবায়ুতে লোহার মরচে ধরে কিন্তু ওর সংকর ধাতু স্টেনলেস স্টিল (Fe + Cr) মরচে পড়ে না একে কলঙ্কহীন ইস্পাত বলে।
17. কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌল ও তাদের আকরিকের নামের তালিকা দেওয়া হল:- 
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌল ও তাদের আকরিক
ধাতু / মৌল আকরিকের নাম
সোডিয়াম (Na) চিলি সল্টপিটার, সাধারণ লবণ, বোরাক্স
অ্যালুমিনিয়াম (Al) বক্সাইট (Al2O3, 2H2O), গিবসাইট (Al2O3, 3H2O), ক্রায়োলাইট (AlF3, 3NaF), কোরান্ডাম, ফেলস্পার
পটাশিয়াম (K) নাইটার, কার্নালাইট (MgCl2, KCl, 6H2O)
ম্যাগনেসিয়াম (Mg) ম্যাগনেসাইট (MgCO3), ডলোমাইট (MgCO3, CaCO3), কার্নালাইট (MgCl2, KCl, 6H2O)
ক্যালশিয়াম (Ca) ক্যালসাইট, জিপসাম, ফ্লুয়োরস্পার
কপার বা তামা (Cu) কপার পাইরাইটিস (Cu2S, Fe2S3 বা 2CuFeS2), কপার গ্লাস (Cu2S), কিউপ্রাইট (Cu2O)
লোহা বা আয়রন (Fe) ম্যাগনেটাইট (Fe3O4), ব্রাউন হেমাটাইট (2Fe2O3, 3H2O) , রেড হেমাটাইট (Fe2O3)
জিঙ্ক (Zn) জিঙ্ক ব্লেড (Zns) , জিঙ্কাইট, ক্যালামাইন ( ZnCO3)
সিসা (Pb) গ্যালেনা, অ্যাংগ্নেসাইট
পারদ (Hg) সিনাবার, ক্যালোমেল
টিন (Sn) টিন পাইরাইটিস, ক্যাসিটেরাইট
সোনা ( Au) ক্যালভেরাইট, সিভানাইট
রুপো (Ag) সিলভার গ্লান্স, রবি সিলভার, হম সিলভার, আর্জেন্টাইট
ফসফরাস (P) ফসফরাইট, ফ্লোরেঅ্যাপেটাইট
থোরিয়াম (Th) মোনাজাইট
ক্রোমিয়াম (Cr) ক্রোমাইট
টাইটানিয়াম (Ti) লিমেনাইট
ম্যাঙ্গানিজ (Mn) পাইরোলুসাইট
টাংস্টেন (Tn) উলফ্রামাইট
ইউরেনিয়াম (U) পিচ ব্লেড
18. কয়েকটি বিশিষ্ট সংকর ধাতুর নাম, উপাদান এবং ব্যবহার নিচে তালিকাতে দেওয়া হল:-
সংকর ধাতু উপাদান ও শতকরা ব্যবহার
পিতল বা ব্রাস Cu - 70%
Zn - 30%
বাসনপত্র, মূর্তি, নল, টেলিস্কোপ ,ব্যারোমিটার ,জলের কল, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ইত্যাদি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
স্টেনলেস স্টিল Fe - 85 - 90%
Cr - 10 - 15%
শল্য চিকিৎসার যন্ত্রপাতি, বাসন পত্র, ছুরি , কাঁচি ও সাইকেলের যন্ত্রাংশ প্রভৃতি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।
ব্রোঞ্জ Cu - 90%
Sn - 10%
যন্ত্রাংশ, বাসন পত্র, মূর্তি, মেডেল, ও অলংকার, প্রস্তুতিতে ব্যবহার করা হয়।
ডুরালুমিন Al - 95% , Mg - 0.5%
Cu - 4 % , Mn - 0.5%
বিমানের কাঠামো, মোটরগাড়ির বিভিন্ন অংশ এবং যন্ত্রাংশ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়।
Next Post Previous Post
1 Comments
  • Unknown
    Unknown May 8, 2021 at 7:49 PM

    🙋

Add Comment
comment url