মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ গুলি আলোচনা করো।

মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ গুলি আলোচনা করো।

মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

উঃ উত্থান-পতন ইতিহাসের অনিবার্য নিয়মে আসে। ৩১৭ বছর ধরে ১৭ জন মােগল সম্রাট ভারতে রাজত্ব করেছিলেন। তাদের মধ্যে প্রথম ৬ জন সম্রাট ১৬৬ বছর রাজত্ব করেছিলেন। ১৫২৬-১৫৪০ খ্রি. এবং ১৫৫৫-১৮৫৭ খ্রি. পর্যন্ত ভারতবর্ষে মােগল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব থাকলেও, ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর পঞ্চাশ বছরের মধ্যে পতন ত্বরান্বিত হয়েছিল। বিশাল মােগল সাম্রাজ্যের গৌরবােজ্জ্বল অধ্যায়ের অবলুপ্তি কিন্তু কোনাে আকস্মিক ঘটনা নয়। ঐতিহাসিক বিপনচন্দ্রের মতে, ক্রমিক অবক্ষয় মােগল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তবে কোনাে একক কারণে এই বিশাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটেনি। প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় কারণেই ঘাত-প্রতিঘাতে এই সাম্রাজ্য একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। নীচে পতনের কারণগুলি দেওয়া হল-

(১) বিশালতা : সুদূর কাবুল-কান্দাহার থেকে পূর্ববঙ্গের শেষ পর্যন্ত এবং উত্তরে কাশ্মীর থেকে দক্ষিণে মহীশূর পর্যন্ত এক বিশাল ভূখণ্ড নিয়ে মােগল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। এত বিশাল সাম্রাজ্যের সর্বত্র যােগাযােগ রক্ষা করে সুশাসন পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিল। বিশেষত ঔরঙ্গজেব উত্তর অযােগ্য সম্রাটদের শাসনকালে রাজধানী দিল্লি থেকে সর্বত্র নজরদারি করা কোনােক্রমেই সম্ভব ছিল না। ফলে সাম্রাজ্যের ভিত একসময় আলগা হয়ে গিয়েছিল।

(২) উত্তরাধিকার আইনের অস্পষ্টতা : প্রাচীনযুগে ভারতে জ্যেষ্ঠপুত্রের উত্তরাধিকার আইন কার্যকরী ছিল। কিন্তু মােগল যুগে সম্রাটের মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে সুস্পষ্ট কোনাে আইন না থাকায় সম্রাটের পুত্র, পৌত্র, আত্মীয়স্বজন, আমীর-ওমরাহ সবাই। সিংহাসন লাভের জন্য মেতে উঠল। শাহজাহানের পুত্র দারা, সুজা, মুরাদ ও ঔরঙ্গজেব এবং ঔরঙ্গজেবের পুত্র মুয়াজ্জম, আজমশাহ ও কামবক্সের মধ্যে সিংহাসন লাভের জন্য তীব্র ভ্রাতৃঘাতী অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। এইভাবে ক্রমাগত উত্তরাধিকার সংক্রান্ত দ্বন্দ্বের ফলে রাষ্ট্রীয় সংহতি ও মর্যাদা যেমন নষ্ট হয়, তেমনি দরবারি পরিবেশ বিষিয়ে ওঠে।

(৩) দূর্বল উত্তরাধিকার : মােগল সাম্রাজ্যের পতনের আরেকটি বড়াে কারণ হল দুর্বল উত্তরাধিকার। ঔরঙ্গজেব-উত্তর সম্রাটদের সবাই শাসনকার্য পরিচালনা অপেক্ষা বিলাস,
ব্যভিচার ও মদ্যপানে মত্ত ছিলেন। অধিকাংশ দুর্বল সম্রাট ছিলেন অতিরিক্তমাত্রায় ইন্দ্রিয় পরায়ণ ও ষড়রিপুর বশ। এই সব দুর্বল রঙ্গিলা সম্রাটদের দায়িত্বহীনতা মােগল সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ী।

(৪) সামরিক শক্তির দুর্বলতা : মােগলদের সামরিক বাহিনীতে বেশিরভাগ সেনা ছিল তুর্কি। যুদ্ধই ছিল তাদের একমাত্র পেশা। কিন্তু যুদ্ধের প্রয়ােজন ফুরিয়ে গেলে তুর্কি সেনারা অলস ও আরাপপ্রিয় হয়ে পড়ে। ঔরঙ্গজেব-উত্তর যুগে সামরিক বাহিনী সাম্রাজ্য-বিজয় বা দেশরক্ষার বদলে সম্রাটদের ও অভিজাতদের অভ্যন্তরীণ আত্মঘাতী সংঘর্ষে বেশি ব্যস্ত থাকত। মােগলবাহিনীতে নৌবাহিনী ছিল না। মােগলবাহিনী যুগােপযােগী হয়ে ওঠেনি। সামরিক শক্তির এই দুর্বলতার জন্যে সামন্ততান্ত্রিক শাসন কাঠামাে ভেঙে পড়ে।

(৫) অভিজাতদের দায়িত্বহীনতা : ঔরঙ্গজেব-উত্তর প্রজন্মের সম্রাটদের দুর্বলতার সুযােগে উচ্চপদস্থ আমির-ওমরাহ প্রভৃতি অভিজাত সম্প্রদায় ক্রমশ কর্তব্য কর্মে অবহেলা করতে শুরু করে। মােগল সাম্রাজ্যের স্তম্ভ এই অভিজাতদের মধ্যে নৈতিক অধঃপতন ও পারস্পরিক হিংসা-দ্বেষ, দ্বন্দ্ব ও দলাদলি মােগল সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বিপন্ন করে তুলেছিল। ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্রের মুঘল দরবারের দল ও দলাদলি’ ('Party and Politics in Mughal Court') গ্রন্থে এই সময়কার অভিজাতদের কাণ্ড-কারখানা লিপিবদ্ধ আছে। মােগল অভিজাতদের মধ্যে শুধু দায়িত্বহীনতা নয়, বিশাল-ব্যভিচার ও মদ্যপানের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল। অভিজাতদের অধঃপতন অভ্যন্তরীণ সংকট বৃদ্ধি করেছিল। এর ফলে বৈদেশিক আক্রমণ ও সীমান্তের সুবাদারদের মধ্যে বিদ্রোহ প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল।

(৬) স্বৈরতান্ত্রিক ত্রুটি : মােগল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থা ছিল স্বৈরতান্ত্রিক ও একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী। সম্রাটের ব্যক্তিগত চরিত্র, বুদ্ধি, কর্মদক্ষতার উপর প্রশাসনের সাফল্য
ও অস্তিত্ব নির্ভর করত। ঔরঙ্গজেবের পর মােগল সম্রাটরা অভিজাত ও আমলাদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, ফলে মােগল সাম্রাজ্য তার স্বৈরতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে। উপযুক্ত ব্যক্তির অভাবে মােগল সাম্রাজ্য দিকহীন নৌকার মতাে দিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

(৭) ঔরঙ্গজেবের নীতি : ঔরঙ্গজেবের ধর্মীয় নীতি, রাজপুত নীতি, দাক্ষিণাত্য নীতি মােগল সাম্রাজ্যের পতনকে সুনিশ্চিত করে তুলেছিল। তার ধর্মীয় নীতির বিরুদ্ধে শিখ, জাঠ, সামি প্রভৃতি জাতি মােগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। রাজপুত নীতির ফলে রাজপুতরা শত্রুতে পরিণত হয়। দাক্ষিণাত্য নীতির ফলে উত্তরাঞলে প্রবল বিদ্রোহ দেখা দেয়।

(৮) অর্থনৈতিক সংকট : মােগল দরবার ছিল জাঁকজমকপূর্ণ, বিশেষ করে শাহজাহানের আড়ম্বরপ্রিয়তা মােগল রাজকোশ দুর্বল করে দেয়। তা ছাড়া ঔরঙ্গজেবের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্রোহ,
বিশাল সাম্রাজ্য পরিচালনার জন্য প্রচুর অর্থের জন্য জনগণের উপর কর ভার মােগল সাম্রাজ্যের পতনের পথকে উন্মুক্ত করে।

(৯) বৈদেশিক আক্রমণ : মােগল সম্রাটদের দুর্বলতার সুযােগে বৈদেশিক আক্রমণের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। অবশেষে ১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে নাদির শাহের এবং ১৭৪৮ ও ১৭৬১ সালে আহম্মদ শাহ আবদালির ভারত আক্রমণ মােগল সাম্রাজ্যের পতনকে সুনিশ্চিত করে তুলেছিল। অবশেষে ইংরেজদের দ্বারা এই সাম্রাজ্যের শেষ প্রদীপের শিখাটুকুও নিভে যায়।

অন্যান্য : উপরােক্ত কারণগুলি ছাড়াও কৃষকবিদ্রোহ, জায়গিরদারি দ্বন্দ্ব ও সংকট প্রভৃতি মােগল সাম্রাজ্যের পতনকে অনিবার্য করে তুলেছিল।

Next Post Previous Post
1 Comments
  • Unknown
    Unknown March 10, 2022 at 6:22 PM

    ধন্যবাদ

Add Comment
comment url